ভেনিস: বিশ্বের অন্যতম ধনী ও প্রভাবশালী প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের প্রেক্ষাগৃহে উপস্থিত ছিলেন না। তবে তাঁকে ঘিরে নির্মিত অস্কারজয়ী নির্মাতা অ্যালেক্স গিবনির তথ্যচিত্র মাস্ক বিশ্ব প্রিমিয়ারে দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
মঙ্গলবার ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের সালা গ্রান্ডেতে ছবিটির প্রদর্শনী শেষে প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানান দর্শকরা। প্রেক্ষাগৃহে উপস্থিত কয়েকজন দর্শককে ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ বলতেও শোনা যায়।
তবে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি ছবিটির দীর্ঘ দৈর্ঘ্য এবং ইলন মাস্ককে নিয়ে নির্মাতার অস্বস্তিকর ও উদ্বেগজনক পর্যবেক্ষণ দর্শকদের মধ্যে ক্লান্তির ছাপও ফেলেছে। প্রায় চার ঘণ্টার এই তথ্যচিত্রটির প্রদর্শনীতে ১০ মিনিটের বিরতিসহ মোট সময় লাগে ২২৫ মিনিট।
মাস্ককে প্রচলিত অর্থে কোনো তারকার জীবনীচিত্র হিসেবে নির্মাণ করেননি অ্যালেক্স গিবনি। বরং ইলন মাস্ক কীভাবে ব্যবসা, প্রযুক্তি ও রাজনীতির ক্ষেত্রে অসাধারণ প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন, সেটিই অনুসন্ধানের মূল বিষয়।
টেসলা, স্পেসএক্স, স্টারলিংক ও এক্স—মাস্কের সঙ্গে যুক্ত এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁর ক্ষমতা ও প্রভাব কীভাবে বিস্তৃত হয়েছে, তা তুলে ধরা হয়েছে তথ্যচিত্রে। পাশাপাশি মার্কিন রাজনীতিতে তাঁর ক্রমবর্ধমান ভূমিকা এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতাও গুরুত্ব পেয়েছে।
২০২২ সালের শেষ দিকে ছবিটির নির্মাণকাজ শুরু করেন গিবনি। শুরুতে তিনি প্রায় দুই ঘণ্টার একটি তথ্যচিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন। ২০২৪ সালের শেষ দিকে তিনি ছবিটির একটি প্রায় দুই ঘণ্টার সংস্করণও প্রস্তুত করেছিলেন বলে জানা যায়। কিন্তু এরপর মার্কিন ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মাস্কের ভূমিকা আরও বিস্তৃত হওয়ায় ছবির বিষয়বস্তুও ক্রমে বড় হতে থাকে।
শেষ পর্যন্ত এটি পরিণত হয় ২২৫ মিনিটের এক দীর্ঘ অনুসন্ধানী তথ্যচিত্রে।
গিবনির উদ্দেশ্য ছিল মাস্ককে ঘিরে তৈরি হওয়া প্রচার, জনপ্রিয়তা ও নানা ধরনের মিথের আড়ালে থাকা বাস্তবতাকে সামনে আনা। বিশেষ করে একজন ব্যক্তির হাতে বিপুল অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েই তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।
তথ্যচিত্রটি ঘোষণার পর থেকেই এর সমালোচনা করে আসছেন ইলন মাস্ক। ২০২৩ সালে গিবনির পরিকল্পনার বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে মাস্ক ছবিটিকে ‘হিট-পিস’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। জবাবে গিবনি প্রশ্ন করেন, ছবিটি না দেখে মাস্ক কীভাবে এমন মন্তব্য করলেন।
পরবর্তীতে দুজনের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাকযুদ্ধ আরও তীব্র হয়। একপর্যায়ে মাস্ক গিবনিকে ‘ডুশ’ বলে আক্রমণ করেন। জবাবে গিবনি সংক্ষিপ্তভাবে লেখেন, ‘ডুশে’—ফরাসি শব্দের একটি রসিকতাপূর্ণ ব্যবহার। ছবিটির মুক্তির আগে থেকেই এই বিতর্ক মাস্ককে ঘিরে দর্শকদের আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ইলন মাস্ককে নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণ অ্যালেক্স গিবনির দীর্ঘদিনের কাজের ধারাবাহিকতারই অংশ। তাঁর নির্মাণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ক্ষমতাবান ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও বিতর্কিত সংগঠনের কর্মকাণ্ড অনুসন্ধান করা।
মার্কিন সামরিক বাহিনীতে নির্যাতনের অভিযোগ নিয়ে নির্মিত ট্যাক্সি টু দ্য ডার্ক সাইড তথ্যচিত্রের জন্য তিনি সেরা তথ্যচিত্র বিভাগে অস্কার লাভ করেন। এর আগে এনরন: দ্য স্মার্টেস্ট গাইজ ইন দ্য রুম ছবির জন্যও অস্কার মনোনয়ন পেয়েছিলেন তিনি।
গিবনির উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে সায়েন্টোলজি নিয়ে নির্মিত গোয়িং ক্লিয়ার, উইকিলিকসকে কেন্দ্র করে উই স্টিল সিক্রেটস এবং থেরানোস প্রতিষ্ঠাতা এলিজাবেথ হোমসকে নিয়ে নির্মিত দ্য ইনভেন্টর: আউট ফর ব্লাড ইন সিলিকন ভ্যালি।
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনের পর মাস্ক তার আন্তর্জাতিক উৎসব ও পুরস্কার মৌসুমের যাত্রা অব্যাহত রাখবে। এর পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ প্রদর্শনীগুলোর একটি হবে টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে।
জিগস প্রোডাকশনের ব্যানারে ছবিটি প্রযোজনা করেছেন অ্যালেক্স গিবনি, জেসি ডিটার ও এরিন এডেইকেন। প্রযোজনায় আরও রয়েছে ক্লোজার মিডিয়া, অ্যানোনিমাস কনটেন্ট ও ডাবল এজেন্ট। আন্তর্জাতিক পরিবেশনা ও বিক্রয়ের দায়িত্বে রয়েছে ব্ল্যাক বিয়ার।
যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচিত প্রেক্ষাগৃহে আগামী ১৬ অক্টোবর মুক্তি পাবে মাস্ক। ২৩ অক্টোবর থেকে দেশটির আরও বিস্তৃত পরিসরে ছবিটির প্রদর্শন শুরু হবে।
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে মাস্ক প্রতিযোগিতা বিভাগের বাইরে প্রদর্শিত হয়েছে। ফলে উৎসবের সর্বোচ্চ পুরস্কার গোল্ডেন লায়নের জন্য এটি প্রতিযোগিতা করতে পারছে না। তবে এবারের উৎসবের শক্তিশালী তথ্যচিত্রের তালিকায় ছবিটিকে অন্যতম আলোচিত সংযোজন হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
চলতি ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের পর্দা নামবে ১২ সেপ্টেম্বর।