উপমহাদেশীয় শাস্ত্রীয়সংগীতের সঙ্গে কর্নাটকী, পারস্য, চৈনিক ও পাশ্চাত্য সংগীতধারার মেলবন্ধন। কোথাও ধ্রুপদের গাম্ভীর্য, কোথাও খেয়ালের রাগাশ্রয়ী বিস্তার, আবার কোথাও অপেরা, ঠুমরি ও ভজনের ভিন্নতর প্রকাশ। সংগীত, অভিনয় ও নাট্যকাহিনির এমন বহুমাত্রিক সমন্বয়ে রাজধানীর ছায়ানট মিলনায়তনে মঞ্চস্থ হলো বিশেষ নাটক ‘সুর সম্মিলন’।
গত ৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক সংগঠন হংসধ্বনির আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই ব্যতিক্রমী পরিবেশনায় শাস্ত্রীয় সংগীতের বিভিন্ন ধারা, ঐতিহ্য ও প্রকাশভঙ্গিকে নাট্যাঙ্গিকে উপস্থাপন করা হয়। প্রায় দেড় ঘণ্টার এই আয়োজনে সংগীতের পাশাপাশি অভিনয় ও মঞ্চনির্ভর বর্ণনার মধ্য দিয়ে দর্শকদের সামনে উন্মোচিত হয় বিশ্বসংগীতের বৈচিত্র্যময় এক পরিসর।
শাস্ত্রীয়সংগীত শিল্পী সাইফুল তানকারের গ্রন্থনা ও পরিচালনায় এবং রতন মজুমদারের নাট্যনির্দেশনায় নির্মিত ‘সুর সম্মিলন’-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সংগীতের বিভিন্ন ধারাকে বিচ্ছিন্ন পরিবেশনা হিসেবে উপস্থাপন না করে একটি সমন্বিত নাট্যকাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা। এর মধ্য দিয়ে শাস্ত্রীয় সংগীতের নান্দনিকতা, ঐতিহ্য ও বৈচিত্র্যকে নতুনভাবে উপলব্ধি করার সুযোগ তৈরি হয়।
সুরের সাধনায় অনুষ্ঠানের সূচনা
তানপুরায় সুর বাঁধা এবং ‘সা’ স্বরের সাধনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন শাস্ত্রীয় সংগীতগুরু পণ্ডিত অসিত দে। সংগীতের মৌলিক স্বরচর্চাকে কেন্দ্র করে সূচিত এই পর্ব যেন পুরো আয়োজনের সাংগীতিক আবহ নির্মাণ করে দেয়।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সরকারি সংগীত কলেজের অধ্যক্ষ নাদিয়া সোমা সামাদ। রিপন কুমার বিশ্বাসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সরকারি সংগীত কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক লাবণী সাহা।

উদ্বোধনী পর্বে পণ্ডিত অসিত দে তানপুরার সাথে সা স্বরে সুর সাধছেন

পণ্ডিতজ্বীর সাথে সম্পূর্ণ মিলনায়তন জুড়ে সকলে সুর মেলাচ্ছেন

পণ্ডিতজ্বীকে সম্মাননা প্রদানের বিশেষ মূহুর্ত
ধ্রুপদ থেকে ভজন : উপমহাদেশীয় সংগীতের বহুমাত্রিক প্রকাশ
সমবেত ধ্রুপদ পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠানের মূল সাংগীতিক পর্ব। এতে অংশ নেন অরণি চৌধুরী, সংযুক্তা, সোনাল সিনহা, প্রতিমা রাণী নট্ট, ওম অভ্র চৌধুরী, ইমরান সরকার, অভিজীত বর্ম্মন, অমিত কর্মকার, ইমন খান ও কবিতা মনি।

উপমহাদেশীয় শাস্ত্রীয়সংগীতের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ধারা ধ্রুপদের গাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশনার পর রাগ ভূপালীতে একক খেয়াল পরিবেশন করেন আর্য শ্রেষ্ঠা ঘোষ।

খেয়াল পরিবেশন করছেন আর্য শ্রেষ্ঠা ঘোষ
কর্নাটকী সংগীত পরিবেশন করেন তুলশী দেবী। অন্যদিকে, রাগ মালকোষে খেয়াল ও তারানা পরিবেশন করে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন সুদীপ দত্ত অহন।

কর্ণাটকী শাস্ত্রীয়সংগীত পরিবেশন করছেন তুলশী দেবী

খেয়াল ও তারানা পরিবেশন করছেন সুদীপ দত্ত অহন
রাগভিত্তিক পরিবেশনার ধারাবাহিকতায় রথিন টিকাদার পরিবেশন করেন বৈরাগী রাগে খেয়াল। ধ্রুপদ, খেয়াল ও তারানার মতো পৃথক সংগীতরীতির উপস্থিতি আয়োজনটিতে উপমহাদেশীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের বিভিন্ন প্রকাশভঙ্গি তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করে।
চৈনিক ও পারস্য সংগীতে আন্তর্জাতিক আবহ
‘সুর সম্মিলন’-এর বিশেষ আকর্ষণ ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের প্রচলিত শাস্ত্রীয়সংগীতের পরিসর অতিক্রম করে অন্যান্য শাস্ত্রীয়সংগীত ও সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্বশীল পরিবেশনা। চৈনিক শাস্ত্রীয়সংগীতের দ্বৈত পরিবেশনায় অংশ নেন ঐক্যজিৎ ও অরুণা। পারস্যের শাস্ত্রীয়সংগীত পরিবেশন করেন ফারজানা মেঘলা, কবিতা মনি ও রোদশী। ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে বিকশিত এসব সংগীতধারাকে একই মঞ্চে উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে আয়োজনটি পায় আন্তর্জাতিক সাংগীতিক মাত্রা। প্রতিটি ধারার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে সংগীতের বৈচিত্র্যকে একটি বৃহত্তর পরিবেশনাকাঠামোয় তুলে ধরাই ছিল এ আয়োজনের উল্লেখযোগ্য দিক।

চৈনিক শাস্ত্রীয়সংগীত পরিবেশন করছেন ঐক্যজিৎ ও অরুণা

পারসিক শাস্ত্রীয়সংগীত পরিবেশন করছেন ফারজানা মেঘলা, কবিতা মনি ও রোদশী
ঠুমরি, ভজন ও পাশ্চাত্য অপেরার সংযোজন
শাস্ত্রীয়সংগীতের বিভিন্ন শৈলীর পাশাপাশি অনুষ্ঠানে স্থান পায় ঠুমরি, ভজন ও পাশ্চাত্য অপেরা। ঠুমরি পরিবেশন করেন প্রণামি পোদ্দার, পাশ্চাত্য অপেরা পরিবেশন করেন জেমিমা তাহসিন রাত্রি এবং ভজন পরিবেশন করেন প্রিয়ন্তি পোদ্দার।
এই পরিবেশনাগুলোর মধ্য দিয়ে সংগীতের আবেগ, কণ্ঠপ্রকাশ ও পরিবেশনরীতির ভিন্ন ভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের রাগাশ্রয়ী সংগীতের সঙ্গে পাশ্চাত্যের অপেরাধর্মী গায়নরীতির উপস্থিতি আয়োজনটিতে বৈচিত্র্য যোগ করে।

ঠুমরি পরিবেশন করছেন প্রণামি পোদ্দার

ভজন পরিবেশন করছেন প্রিয়ন্তি

অপেরা পরিবেশনা করছেন জেমিমা তাহসিন রাত্রি
সংগীতের সঙ্গে অভিনয়ের সমন্বয়
‘সুর সম্মিলন’-এর পরিকল্পনায় সংগীতের পাশাপাশি নাট্য উপস্থাপনাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেন অর্ক সরকার, বিত্ত সোম, হুমায়ন আহমেদ রাহাত, চার্লি, রথিন টিকাদার, অনির্বাণ হালদার, সিফাত প্রধান, তাকবির খান ও অংকিতা মজুমদার।
সংগীত পরিবেশনার সঙ্গে চরিত্রনির্ভর অভিনয় ও নাট্যাংশ যুক্ত হওয়ায় আয়োজনটি প্রচলিত একক সংগীতানুষ্ঠানের কাঠামো থেকে আলাদা হয়ে ওঠে। সংগীতের ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য ও প্রকাশভঙ্গিকে নাট্যরীতির মাধ্যমে উপস্থাপনের এই প্রয়াস শাস্ত্রীয়সংগীতকে দর্শকের কাছে আরও দৃশ্যমান ও অভিজ্ঞতানির্ভর করে তোলার একটি বিকল্প পথ নির্দেশ করে।

মহারাজের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন অর্ক সরকার

সংগীত বিষয়ক মন্ত্রীর ভূমিকায় ছিলেন হুমায়ন আহমেদ রাহাত

মুখ্যমন্ত্রীর ভূমিকায় ছিলেন বিত্ত সোম

তান্ত্রিকের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন চার্লি

রাজপণ্ডিতের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন রথিন টিকাদার

রাজ জ্যোতিষীর ভূমিকায় ছিলেন অনির্বাণ হালদার

ঘোষকের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন সিফাত প্রধান
পুরো আয়োজনের সাংগীতিক আবহ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন যন্ত্রশিল্পীরা। তবলায় ছিলেন গৌতম কুমার সরকার ও প্রশান্ত কুমার দাস। সাজযন্ত্রে জাহিদ, ভায়োলিনে নুপুর, হারমোনিয়ামে সাইফুল তানকার ও রথিন টিকাদার এবং তানপুরায় প্রতিমা নট্ট ও ইমরান সরকার সহযোগিতা করেন। কিবোর্ড ও আবহসংগীতের দায়িত্বে ছিলেন ফরহাদ হোসেন। কণ্ঠসংগীত, যন্ত্রসংগীত, আবহ এবং অভিনয়ের সম্মিলিত প্রয়াসে ‘সুর সম্মিলন’ হয়ে ওঠে একটি সমন্বিত মঞ্চপ্রযোজনা।
শাস্ত্রীয়সংগীতকে নতুনভাবে উপস্থাপনের প্রয়াস
শাস্ত্রীয়সংগীতের পরিবেশনা সাধারণত রাগ, তাল, লয়, স্বরবিস্তার ও শিল্পীর নিজস্ব সংগীতসাধনাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। ‘সুর সম্মিলন’এর বিশেষত্ব হলো, এই সংগীতধারাকে নাট্যকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করে একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা।
একই আয়োজনে ধ্রুপদ, খেয়াল, তারানা, কর্নাটকী সংগীত, চৈনিক ও পারস্য সংগীত, ঠুমরি, ভজন এবং পাশ্চাত্য অপেরার উপস্থিতি দর্শকদের সামনে বিভিন্ন সংগীতঐতিহ্যের স্বাতন্ত্র্য ও বৈচিত্র্য তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করেছে।

সাইফুল তানকারের গ্রন্থনা ও পরিচালনা এবং রতন মজুমদারের নাট্যনির্দেশনায় নির্মিত এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে হংসধ্বনি শাস্ত্রীয়সংগীতকে প্রচলিত পরিবেশনা কাঠামোর বাইরে এনে নাট্য ও দৃশ্যশিল্পের সঙ্গে সমন্বিতভাবে উপস্থাপনের একটি প্রয়াস গ্রহণ করেছে। ঐতিহ্যনির্ভর সংগীতচর্চার সঙ্গে সৃজনশীল মঞ্চপরিকল্পনার এই সংযোগ ভবিষ্যতে শাস্ত্রীয়সংগীতের পরিবেশনা ও উপস্থাপনার নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।